কাল খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শুভ বড় দিন

December 24, 2016 5:51 PMViews: 75

 

তৈয়বুর রহমান টনি নিউ ইয়র্কঃ

শুভ বড় দিন মানে ঈসা মসীহের শুভ জন্মদিন। বেথলেহেমের গরীব কাঠুরের গোয়াল ঘরেই যীশু খ্রিস্টের জন্ম। কুমারী মেরির গর্ভে যীশু খ্রিস্টের জন্ম। ধর্মবিশ্বাস বলে, ‘ঈশ্বরের অনুগ্রহে ও অলৌকিক ক্ষমতা মেরি কুমারী হওয়া সত্ত্বেও গর্ভবতী হন। ইসলাম ধর্মবিশ্বাসে তাকে হযরত ঈসা (.) বলা হয়। ইউসুফের সঙ্গে ঈসার মা মারিয়ামের বিয়ে ঠিক হয়েছিল।

মারিয়ার স্বামী কাঠমিস্ত্রী যোসেফ ছিলেন যিশুর পালক পিতা মাত্র।রাতের বেলা বেথলেহেমের মাঠে ভেড়া চড়াচ্ছিল একদল রাখাল। যিশুর জন্মের পরপরই স্বর্গের দূতেরা এসে তাদের বলল, ওই গোয়ালঘরে তোমাদের উদ্ধারকর্তা জন্মেছেন, যাও তাঁকে শ্রদ্ধা জানাও এবং ঈশ্বরের প্রশংসা করো। রাখালেরা তাই করল। যিশুর জন্মের পরপরই আকাশের বুকে ফুটে উঠেছিল একটি বিশেষ তারা। পূর্ব দেশের পণ্ডিতেরা সেই তারা দেখে বুঝতে পারলেন, পৃথিবীতে সেই মহান রাজার জন্ম হয়েছে, ঈশ্বর যাঁকে পাঠানোর কথা বলেছিলেন মানবজাতির মুক্তির জন্য। পূর্ব দেশের তিন পণ্ডিত বহু দূর দেশ থেকে বেথলেহেমে রওনা হলেন তাঁদের রাজাধিরাজকে শ্রদ্ধা জানাতে।

 ২ হাজার বৎসর আগে এই শুভদিনে পৃথিবীকে আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন খ্রিষ্টধর্মের প্রবর্তক মহান যীশু খ্রিস্ট। খ্রিস্ট ধর্মানুসারীরা বিশ্বাস করেন মর্তের কোন পুরুষের সহবাস ছাড়াই যীশু খ্রিষ্টের জন্ম। সেই অর্থে খ্রিস্ট ধর্মানুসারীদের কাছে তিনি ঈশ্বরের পুত্র। আরবের (বর্তমান ফিলিস্তিন) বেথেলহেম নামক স্থানে একটি দীনদুঃখী পরিবারের ভাঙা গোয়ালঘরে যাব পাত্রে তিনি ভূমিষ্ঠ হন। সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় সেখান হতেই বিকশিত হয় মুক্তির এই আলোর দিশারী, যার স্পর্শে পাপের পংকিল আবর্ত মানুষের অন্তরে এনে দেয় শান্তির পরশ। ইসলাম ধর্মে যীশু খ্রিস্ট হযরত ঈসা (আঃ) নামে পরিচিত। তাকে আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ হিসেবে মুসলমানরা শ্রদ্ধা করেন। প্রতিবছর ২৫ ডিসেম্বর যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন উপলক্ষে এই উৎসব পালিত হয়। এই দিনটিই যীশুর প্রকৃত জন্মদিন কিনা তা জানা যায়নি। তবে আদিযুগীয় খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুসারে, এই তারিখের ঠিক নয় মাস পূর্বে মেরির গর্ভে প্রবেশ করেন যীশু। আর এই হিসাব অনুসারেই ২৫ ডিসেম্বর যীশুর জন্মোৎসব পালন করা হয়।

 বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আনন্দঘন পরিবেশে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর সাথে দেশবাসী ‘ক্রিসমাস ডে’ (শুভ বড়দিন) উদযাপন করে থাকেন। ২৫শে ডিসেম্বার ক্রিসমাস ডে হলেও ২৪শে ডিসেম্বার সন্ধ্যা থেকেই উৎসব শুরু হয়ে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্রিসমাসের ছুটি শুরু হয় বেশ আগে থেকেই, অফিস ছুটি থাকে ২৪শে থেকে নিউ ইয়ার পর্যন্ত। সারা আমেরিকা জুড়েই থাকে উৎসবের আমেজ। ২৪শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় (খ্রিস্টমাস ইভ) থেকেই সামাজিক এবং পারিবারিক প্রীতিবন্ধনের সমাবেশ থেকে এই মহাজন্মোত্সবের সুচনা হয়। তবে এই উৎসবের প্রস্তুতি চলেছে মাসব্যাপী। প্রথা অনুসারে নভেম্বরের শেষ বৃহস্পতিবার থ্যাঙ্কস গিভিং দিবসের পরে ব্লাক ফ্রাইডে থেকে প্রিয়জনদের জন্য উপহার সামগ্রী সংগ্রহের মাধ্যমে এই মহা উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়।

বড়দিন উপলক্ষে নিউইয়র্কের বিখ্যাত রকফেলার সেন্টারে ক্রিসমাস ট্রি উন্মুক্ত করা হয়েছে। ৭৬ ফুট দীর্ঘ বৃক্ষটি ৪৫ হাজার নানা রঙের বাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। ১৯৩৩ সাল থেকে প্রতি বছর বড়দিনে নিউইয়র্কের রকফেলার সেন্টারে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়। উৎসবের আনন্দে শামিল হতে প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অসংখ্য পর্যটক বেড়াতে যান। মাসব্যাপী বাসা বাড়ীতে আলোক সজ্জা, গির্জাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শপিং মল ও বাসাবাড়িতে ‘ক্রিসমাস ট্রি’ স্থাপন, রংগীন বল, জড়ি, ক্যান্ডীসহ নানা উপকরণে ক্রিসমাস ট্রি সজ্জা, প্রীতিভোজ, খ্রিস্টমাস কেক কাটার আনন্দের মধ্য দিয়ে উত্সবের সামাজিক পর্বটি সমাপ্তি হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি স্তরে আদান প্রদান করা হয় উপহার সামগ্রীআয়োজন করা হয় প্রীতিভোজের। সিক্রেট সান্তার লুকোচুরির খেলায় গিফট আদান প্রদান হয়ে থাকে মহা আনন্দ ধারায়। এই সময় শপিং মলগুলি হয়ে উঠে প্রানচাঞ্চল্য। রংগীন সজ্জায় সজ্জিত মলে স্থাপিত দীর্ঘ ‘ক্রিসমাস ট্রি আর লাল পোষাক আর ধবধবে সফেদ চুলদাড়ি, উপহার ভর্তি কাঁধের লাল ঝোলা শিশুদেরকে দারুন ভাবে আকৃষ্ট করে। শপিং মলগুলির উপচে পড়া ভীড় বাংলাদেশের ঈদের বাজারকেই স্নরণ করিয়ে দেয়। সত্যিকার অর্থে দেশে ঈদের আনন্দ প্রবাসে এই ‘ক্রিসমাস ডে’র আনন্দের সমার্থ হয়ে উঠে। ‘ক্রিসমাস ডে’ উপলক্ষে প্রায় প্রতিটি বাড়ীই সাজানো হয় বর্নিল আলোক সজ্জায়। অনেকেই গাড়ী নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে এই আলোক সজ্জার দৃষ্টি নন্দন শোভা অবলোকনে।

ক্রীসমাস ট্রি ছাড়া ক্রীসমাস উৎসবের সবচেয়ে বড় আইকন হচ্ছে স্যান্টা ক্লজ। স্যান্টা ক্লজ বলতে ছোট ছোট শিশুরা অজ্ঞান। তারা মনে করে, স্যান্টা ক্লজ বাচ্চাদের পরম বন্ধু, স্যান্টা ক্লজ খুব দয়ালু। ক্রীসমাসের সময় সুদূর উত্তর মেরু থেকে স্যান্টা তার পিঠে বাচ্চাদের জন্য উপহারের বোঝা নিয়ে আসে, প্রতি বাড়ী বাড়ী যায়, সে বাড়ীর বাচ্চাটির জন্য উপহারটি রেখে দিয়ে চলে যায়। কোথায় যায় স্যান্টা? স্যান্টা কোথাও থামেনা, পৃথিবীর যত শিশু আছে, তাদের প্রত্যেকের কথা স্যান্টা জানে। কাজেই স্যান্টাকে দৌড়ের উপর থাকতে হয়। তবে ভাগ্য ভালো, স্যান্টা আসে শ্লেজ গাড়ীতে চড়ে। নয়টি রেইন ডিয়ার চালায় স্যান্টার শ্লেজ। তাই ভারী শরীরখানা নিয়ে স্যান্টাকে হাঁটতে হয় না। স্যান্টা এত মোটা কেনো? এ প্রশ্ন যে কোন বাচ্চাকে করা হলে, খুব সহজে উত্তর দেয়, সবার বাড়ীতে গিয়ে স্যান্টাকে ‘দুধ আর কুকী’ খেতেই হয়, তাই স্যান্টা অমন মোটা হয়ে গেছে। শিশু মনের আধুনিক উত্তর।এমনি করেই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব হয়ে উঠে সর্বজনীন উত্সব।


খ্রিস্টমাস ইভের আলোক ছটায় নানা আয়োজনে, আবেগ আর অনুভুতি নিয়ে ‘ক্রিসমাস ডে’ আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় বন্ধু এবং পরিবারের প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে। সারা মাসব্যাপী পাওয়া উপহার সামগ্রী যা বাড়ীতে স্থাপিত ‘ক্রিসমাস ট্রি” পাশে জমা ছিল, সকলের উপস্থিতিতে সেই উপহার সামগ্রীগুলি খোলা হয় আনন্দ চিত্তে। রাতে প্রতিটি বাড়ীতেই আয়োজন করা হয় সুস্বাদু খাবারের। সারা রাত আনন্দ উল্লাসের মধ্যে কেটে যায় প্রতিক্ষিত এই উৎসবের তার। ২৫শে এ দুপুরে প্রধান আয়োজন প্রার্থনা সভার। এই সময় দল বেধে নতুন পোষাকের সাজ সজ্জায় ছুটে যায় গীর্জায়।অংশ নেবে পৃথিবীর সকল মানুষের কল্যানে বিশেষ প্রার্থনার।‘ক্রিসমাস ডে’ উপলক্ষে আমেরিকার খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী বাংলাদেশী আমেরিকানরা আয়োজন করে থাকে নানা অনুষ্ঠানের।

আমাদের দেশে বড়দিন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও যিশুর জন্মদিন ঘটা করে পালন করা হয়। এ দিন বড় বড় হোটেলগুলোতে বিশেষ আয়োজন থাকে। সাজানো হয় ক্রিসমাস ট্রিও। তবে অন্যান্য দেশে পাইন গাছ দিয়ে ক্রিসমাস ট্রি বানানো হলেও আমাদের দেশে সাধারণত ব্যবহৃত হয় ঝাউগাছ। আবার ক্রিসমাসের খাবার হিসেবে কেকের পাশাপাশি বাঙালি খাবারের মত িঠাপুলি, পোলাও, মাংস, বিরিয়ানী, এসবও থাকে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো ক্রিসমাস ক্যারল বা ক্রিসমাসের যে গানগুলো গাওয়া হয়, সেগুলোও সব ইংরেজি গানই গাওয়া হয় না। তার মধ্যে থাকে ভাটিয়ালী গান, কীর্তন, এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীতও। এ ছাড়া আরেকটি মজার ঘটনা হচ্ছে, আমেরিকার আগেও আমাদের দেশে ক্রিসমাস পালন শুরু হয়! কারণ আমেরিকায় ক্রিসমাসের দিনটিকে ছুটির দিন হিসেবে পালন করা শুরুই হয় ১৮৭০ সালে। অথচ ব্রিটিশরা এদেশে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকেই আমাদের দেশে বড়দিনে ছুটি পালন করা হয়।

 

 

Leave a Reply


*