কলকাতার পাঠকদের সাথে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ব্যাপক পরিচয়ের সূত্রপাত ।

September 19, 2014 1:31 AMViews: 69

মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান খোকা : এ কথা আমরা সবাই জানি এবং মানি যে, সীমাবদ্ধ পরিবেশের মধ্যে থেকে বেড়ে উঠা মানুষের শিক্ষা-মেধা-সংস্কৃতি-সাহিত্য-কর্মজ্ঞান-কর্ম সংস্থান কোনো কিছুরই বিকাশ সাধিত হয় না । হওয়া সম্ভবপরও নয় । কারণ, গণ্ডির বাইরেও যে বিশাল জগৎ আছে তার অনুসন্ধান না করলে মননশীলতা অর্জন করা অসম্ভব । আমি বাংলাদেশে পুস্তক ব্যবসার সাথে দীর্ঘ ৩৮ বছর যাবৎ জড়িত । এর মধ্যে ৩০ বছর যুক্ত আছি প্রকাশনার সাথে । আমি কেন, কি কারণে প্রকাশক হলাম (যদিও প্রকাশক হওয়ার আদৌ কোনো যোগ্যতা আমার আছে কিনা তাতে আমি সম্দাহীতভাবে সন্দিহান) তা বহুবার বহুস্থানে আলোচনা করেছি । তবে মোদ্দ কথা হলো, দেশের জন্য যেমন যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি তেমনি বাংলাদেশের বইয়ের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রকাশনায় এসেছিলাম । আমি সবার আন্তরিক সহযোগিতায় খুব দ্রুততার সাথে সে লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলাম । যদিও এজন্য আমাকে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়েছে প্রতিনিয়ত ।

১৯৯৩ সালে কলকাতাস্থ বাংলা একাডেমী’র এজেন্ট ‘নয়া উদ্দ্যোগ’-এর প্রকাশক পার্থ বসু আমার প্রকাশনায় এসে আমার বইগুলোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন । আমি তাঁকে আমাদের প্রকাশিত গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ শিশু-সাহিত্যের বইগুলো কলকাতায় বাজারজাতকরণের জন্য অনুরোধ করলে তিনি বললেন, ‘আপনাদের দেশের লেখকদের বই তো কলকাতার বাজারে চলে না, বাংলা একাডেমীর গবেষণামূলক বই কিছু চলে, তা ছাড়া আর কোনো বই চলে না । আপনাদের দেশের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে জসিম উদ্দীন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শামসুর রাহমান ছাড়া আর কোনো লেখকের নাম কলকাতার লোকেরা জানে না।’ বিষয়টি কৌতূহলী করে তুললো আমাকে । মনের কোণে একধরনের ক্ষোভ তৈরী হলো । কলকাতার অধিকাংশ প্রকাশনার সিংহভাগ বই যেখানে বাংলাদেশের বাজার দখল করে আছে সেখানে বাংলাদেশের বই তো দূরের কথা লেখকদের নাম পর্যন্ত কলকাতার লোকেরা জানবেন না, এটা কিভাবে সম্ভব !

19092014_04_KHOKA_BHAI

সিদ্ধান্ত নিলাম, কলিকাতা পুস্তক মেলায় অংশগ্রহণ করে বিষয়টি যাচাই করবো । আমি ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে অমর একুশে গ্রন্থমেলা এবং দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে বইমেলার সাথে যুক্ত রয়েছি কিন্তু দেশের বাইরে কোথাও কোনো মেলা করার অভিজ্ঞতা তখনো পর্যন্ত আমার হয়নি । কলকাতার বই রপ্তানীকারক বন্ধু শ্রী লক্ষ্মী নারায়ণ সাহা (প্রয়াত)’র সাথে যোগাযোগ করে ‘কলিকাতা পুস্তক মেলা’য় কিভাবে একটি স্টল নেওয়া যায় তা জানাতে তাঁকে অনুরোধ করলাম । তিনি জানালেন, একটি একশ’ স্কোয়ার ফিটের স্টলের জন্য কলিকাতা পাবলিশার্স এন্ড বুক সেলার্স গিল্ড ভাড়া নিবে প্রায় ছয় হাজার রুপি । তারা কেবল বাঁশ দিয়ে স্টলের ফ্রেম তৈরী করে দিবে আর বিদ্যুৎ সংযোগ দিবে । এরপর নিজ খরচে স্টল তৈরী করে নিতে হবে । স্টল নিজে তৈরী করতে গেলে অনেক ব্যয় হবে তবে ডেকোরেটরদের ঠিকা-চুক্তিতে দিলে সাত/আট হাজার রুপি পড়বে । এছাড়া গ্রন্থ-তালিকার জন্য বাধ্যতামূলক পাঁচশত রুপি । সব মিলিয়ে তের হাজার পাঁচশত/ চৌদ্দ হাজার পাঁচশত রুপির মতো লাগবে (তখন বাংলাদেশের ১০০ টাকা = ভারতীয় ৮০ রুপি ছিল) । আমি তাঁর কথা মতো সম্মতি হয়ে ১৯৯৪ সালের পুস্তক মেলায় অংশগ্রহণের জন্য একটি ১০০ স্কোয়ার ফিটের স্টলের পুরো রুপি পেমেন্ট করে বরাদ্দ নিলাম । স্টল ডেকোরেটরের দ্বায়িত্ব দিলাম মন্টু বাবুকে । তখন গিল্ডের মেলা উদ্বোধন এবং শুরু হতো জানুয়ারী মাসের শেষ বুধবারে (এখন উদ্বোধন হয় মঙ্গলবার, মেলা শুরু হয় বুধবার থেকে) । মোট মেলার পরিধিকাল ১২ দিন ।

কলিকাতা পুস্তক মেলায় বিগত বছরগুলোতে পাঁচ হাজার স্কোয়ার ফিট জায়গায় ‘বাংলাদেশ প্যাভেলিয়ন’ তৈরী হতো । সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, যেমন– এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলা একাডেমী, নজরুল ইন্সটিটিউট, শিশু একাডেমীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মেলায অংশগ্রহণ করতো । দে্শের দুই শ্রেষ্ঠ বেসরকারী প্রতিষ্ঠান– মুক্তধারা এবং দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লি: তাঁদের স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে মেলায় অংশ নিতেন । সেদিক থেকে আমি একটু ভিন্নতর । আমি বিদ্যাপ্রকাশ-এর বইগুলো ছাড়াও অন্যান্য প্রকাশনীর খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকদের উল্লেখযোগ্য বইগুলো সংগ্রহ এল/সি-র মাধ্যমে কলকাতায় পাঠিয়ে সরাসরি মেলায় অংশগ্রহণ করি । মেলায় আমি আমার স্টলের নাম দিলাম ‘বাংলাদেশের বই’ । নিচে ছোট্ট করে লিখলাম ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ । মেলা শুরুর কয়েকদিন আগে থেকে দৈনিক ‘আনন্দবাজার’, ‘বর্তমান’ এবং সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জানান দিয়েছি, গড্ডলিকাপ্রবাহের বই নয়, আমরা বাংলাদেশের খ্যাতিমান লেখকদের বইগুলো নিয়ে কলিকাতা পুস্তক মেলায় হাজির হয়েছি ।

উদ্বোধনের দিন থেকে লক্ষ্য করলাম, আমার স্টলে যাঁরা আসছেন তাঁদের অধিকাংশ ‘বাংলাদেশ’ নামটা দেখে আবেগ-আপ্লুত হয়ে স্টলে ঢুকছেন– বই কেনার জন্য নয় ! তাঁরা আমার কুশলাদী জিজ্ঞেস করছেন, দেশের কথা, ঢাকার কথা ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন । এঁদের কেউ কেউ অনেক আগে বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে অভিবাসী হয়েছেন । মনে হলো, নস্টালজিয়া তাঁদের ভিতরে প্রচন্ডভাবে কাজ করছে । কলকাতার স্থানীয়রা যাঁরা আসছিলেন, তাঁরা বললেন, ‘আপনাদের বইগুলোর তো অনেক দাম । আমরা তো আপনাদের লেখক-সাহিত্যিকদের কারও কোনো লেখার সাথে পরিচিত নই । কোনটা কিনবো বুঝতে পারছি না ।’ বললাম, ‘দামের নিয়ে ভাববেন না, অনেক কম দাম রাখাবো । আপনি কোন্ বিষয়ের প্রতি পড়তে আগ্রহী বলুন, আমি সে বইটি বাছাই করে দিচ্ছি, নিয়ে যান । বাসায় গিয়ে একটু পড়ে দেখুন, ভালো না লাগলে মেলা চলাকালে ফেরৎ নিয়ে আসবেন, আপনার গাড়িভাড়া সহ টাকা ফেরৎ দিয়ে দিবো ।’ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে কেউ কেউ তখন একটি বই কিনেছেন । তবে তাঁদের মধ্যে কেউই আর বই ফেরৎ নিয়ে আসেননি বরং দু একজন এসে আমাদের লেখকদের লেখার প্রশংসা করে গেছেন । মেলায় লক্ষণীয় একটি বিষয় ছিল, ধর্মীয় বইয়ের ব্যাপক চাহিদা । কিন্তু আমি কোনো ধর্মীয় বই নিয়ে যাইনি । এভাবে শুরু হলো আমার কলকাতার পাঠকের মাঝে বাংলাদেশের লেখক এবং তাঁদের বইয়ের প্রচারণা ।

১৯৯৫ সালে কলিকাতা পুস্তক মেলায় বাংলাদেশের আটজন উল্লেখযোগ্য লেখকের ছবিসহ সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়ে একটি লিফলেট প্রকাশ করি । মেলার মূল প্রবেশ পথে এবং আমার স্টল থেকে তা সবার মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা করি । দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দেই মেলায় বাংলাদেশের বইয়ের কথা । ১৯৯৬ সালে কলকাতার পাঠকদের সাথে বাংলাদেশের লেখকদের সরাসরি পরিচয় করার উদ্দেশ্যে দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, কবি অসীম সাহা, আনোয়ারা সৈয়দ হককে মেলায় আমার স্টলে বসে পাঠকদের সাথে মতবিনিময়ের ব্যবস্থাটির কথা জানিয়ে দেই । এঁরা আমার আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন ।

১৯৯৭ সালে স্টলের আয়তন আরো বড় করে ২০০ স্কোয়ার ফিট বরাদ্দ নেই । সেবার প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান, প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনকে অতিথি করে মেলায় আমন্ত্রণ জানাই । দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচার করি বাংলাদেশের লেখকদের সাথে পরিচিত হতে বিদ্যাপ্রকাশ-এ আসার জন্য । হ্যান্ডবিল দিয়ে কোনদিন কোন লেখক আমার স্টলে থাকবেন তা প্রচার করি । আমার অতিথি হওয়ার কথা থাকলেও শওকত ওসমান এবং ইমদাদুল হক মিলনকে কলকাতার ভিন্ন দুটি সংগঠন আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসেন । কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শেষ মুহূর্তে আর কলকাতায় আসতে পারেননি । ইমদাদুল হক মিলন আমার স্টলে তিনদিন এবং শওকত ওসমান অসুস্থ শরীর নিয়েও দুদিন আমার স্টলে বসেছিলেন । কলকাতায় ক্যান্সার চিকিৎসারত শক্তিমান কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অকস্মাৎ আমার স্টলে এসে উপস্থিত হয়ে আমাকে বিস্মিত করেছিলেন ! তিনি তাঁর লেখা– চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা এবং দুধভাতে উৎপাত বই তিনটি আমার স্টলে দেখে খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন ।

এ ছাড়াও বাংলাদেশের কবি-শিল্পী-অভিনেতা যখন যাঁকে আমার স্টলে পেয়েছি তাঁদের সাথে স্থানীয় পাঠকদের পরিচয করিয়ে দিয়েছি । ১৯৯৭ সালে বই মেলাটি মাত্র ছয়দিনের মাথায় চারভাগের তিনভাগ অংশ অকস্মাৎ আগুনে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায় । আমার স্টলটিও আমার চোখের সামনে পুড়ে ভুষ্মিভূত হয় । আমার মতো শত শত প্রকাশকের অশ্রুজল সে আগুনকে নেভাতে পারেনি । সেবার প্রচুর পরিমাণে ধর্মীয় বইসহ অন্যান্য বিষয়ক বই– যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় চারলক্ষ রুপির মতো হবে তা মুহূর্তে আগুনে মিশে বিনাশ হয়ে গেল ।
রাজ্য সরকার এবং গিল্ড কর্তৃপক্ষ দুদিনের মধ্যে কোনোমতে স্টল তৈরী করিয়ে পুনরায় মেলা শুরু করলেন । আমাকেও একটি স্টল দেওয়া হলো । মেলায় অর্জুন নামে একজন যুবক আমাকে সহযোগিতা করতো । সে আমার আংশিক বা অর্ধপোড় খাওয়া কিছু বই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বের করে এনে নতুন স্টলের টেবিলে সাজিয়ে রাখলো । পাঠক-দর্শকরা যাঁরা আসছেন তাঁরা বইগুলো দেখে চোখের পানি ফেলেছেন । তাঁদের মধ্যে অনেকে আমার জন্য প্রতিদিন কিছু না কিছু হালকা নাস্তা নিয়ে আসতেন । তাঁদের আমি চিনতাম না । কোনোদিন দেখিওনি । বুঝতে পারি, তাঁরা শুধু বইকে ভালোবাসতেন বলে আমার প্রতি এতটুকু সহৃদয় হয়েছেন । আমার ভাড়া করা গুদামে অল্প কয়েকটি বই ছিল তা দিয়ে মেলার বাকী দিনগুলো পার করে দিলাম ।

মেলায় যাদের স্টলগুলো ইন্স্যুরেন্স করা ছিল তাঁরা টাকা পেলেন । ছোট ছোট প্রকাশকদের পাবলিশার্স গিল্ড থেকে থোক বরাদ্দ দেওয়া হলো কিন্তু আমি বিদেশী বলে আমার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হলো না । কলকাতাস্থ বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হলো না । এমনকি গিল্ডের সাথে কথা বলে আমাকে সহযোগিতা করার সুপারিশের জন্যেও কেউ এগিয়ে আসেননি । আরো বেশ কিছুদিন পর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের গ্রন্থগার মন্ত্রণালয় আমার কাছ থেকে তালিকা সংগ্রহ করে পঁয়ত্রিশ হাজার রুপির কিছু বই ক্রয় করেছিল । আমি যখন সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরলাম তখনও একই চিত্র দেখলাম । বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি বা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কেউ-ই আমার জন্য দু:খ প্রকাশ করা বা সৌজন্যতা প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন না । যেন এটাই আমার প্রাপ্য ছিল এবং আমি তা পেয়েছি ।

১৯৯৮ সালে আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে সে বছর মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারলাম না । গিল্ড কর্তৃপক্ষ ১৯৯৯ সালে মেলার জন্য বাংলাদেশকে থিম কান্ট্রি ঘোষণা করলো । থিম কান্ট্রির বিষয়টি হলো, একটি দেশকে মেলায় বিভিন্নভাবে ফোকাস করার সুযোগ করে দেওয়া । যে দেশ থাম কান্ট্রি হবে সে-দেশই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করবেন । প্রতি বছর কোনো না কোনো দেশকে থিম কান্ট্রি করা হয়ে থাকে । ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশকে থিম কান্ট্রি মনোনীত করা হলো । মেলায় প্রধান অতিথি রাখা হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । উদ্বোধক রাখা হলো কবি শামসুর রাহমানকে । তখন বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃত বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন জনাব ওরায়দুল কাদের । তিনি মেলায় অংশগ্রহণে অনিহা প্রকাশ করলেন । আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে মেলায় সরকারী পর্যায়ে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সম্মত করালাম ।

ইতোমধ্যে আমি ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে সৃজনশীল প্রকাশনাকে পেশাদারীত্বরূপে গড়ে তোলা, স্কুল-কলেজ-পাড়া-মহল্লাগুলোয় পাঠাগার গড়ে তোলা, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং জাতীয় গণগ্রন্থাগারে বইক্রয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা, বাংলাদেশের প্রকাশনাকে বিশ্বায়নের সাথে সংযুক্ত করা সহ প্রভৃতি কাজগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য অগ্রজ-অনুজ সহ ৩৩জন উল্লেখযোগ্য প্রকাশক নিয়ে ‘বাংলাদেশ প্রকাশক পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করাই । পরবর্তী ২০০২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধন করার সময় এটির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’ করা হয় । ওই সময় আমি সমিতির সকল প্রকাশকদের কলকাতায় বাংলাদেশের বইয়ের পাঠকবৃদ্ধির এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সম্মিলিতভাবে মেলায় অংশগ্রহণে অনুরোধ জানাই । সবার আগ্রহ ও উৎসাহে সেবারই প্রথমবারের মতো আমরা সম্মিলিতভাবে ২৪টি প্রকাশনা সংস্থা দেশের বাইরে পুস্তক মেলায় অংশগ্রহণ করি । বিশাল আকৃতির বাংলাদেশ প্যাভেলিয়নের পাশে আমাদের প্যাভেলিয়নটি থাকায় তা দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় । যদিও আমাদের স্টলগুলো একটি কম্পাউন্ডের ভিতরে আলাদা আলাদাভাবে তৈরী করা হয়েছিল ।

২০০০ সালে মাত্র ৯জন প্রকাশককে কলিকাতা পুস্তক মেলায় নিয়ে যেতে পারি । সে বছরে সরকারী পর্যায়ে দেন-দরবার করে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান একই প্যাভেলিয়নের ভিতরে থাকার সিদ্ধান্ত হয় । যার ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান । এতে ক্রেতা-দর্শকদের জন্য খুবই সুবিধা হয়েছে । তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ছোটাছুটি করে স্টল খুঁজতে হচ্ছে না । কলিকাতা পুস্তক মেলার অংশগ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট ৭/৮জন প্রকাশক ছাড়া বাকীরা ছিল অনিশ্চিৎ । অনেকে যেতে চাইতেন না । তাঁদেরকে অথবা যাঁরা পূর্বে যাননি তাঁদেরকে বুঝিয়ে-শুঝিয়ে নিয়ে যেতে হতো । তাঁদের বইগুলো কলকাতা পাঠানো থেকে শুরু করে স্টলে পৌছে দেওয়ার দ্বায়িত্বটি আমাকে নিতে হতো । ধীরে ধীরে প্রকাশকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে । সেই সাথে বেড়েছে বিক্রির পরিমাণও । ২০০২ সাল থেকে দর্শকদের চেয়ে ক্রেতার পরিমাণ বেড়েছে পারদ গতিতে । মানুষ এখন দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ প্যাভেলিয়নে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করে । এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য ।

২০০৭ সালে আমি যখন নির্বাহী পরিচালকের দ্বায়িত্ব হস্তান্তর করি । তার আগ পর্যন্ত দেখেছি প্রতি বছর ২৩/২৪জন প্রকাশক নিয়মিতভাবে কলিকাতা পুস্তক মেলায় অংশ নিচ্ছেন । নতুনরাও আসছেন । কিন্তু স্থান সঙ্কুলানের কারণে তাঁদের স্টল বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না । সরকারী ৪টি প্রতিষ্ঠানের জন্য এক হাজার স্কোয়ার ফিট আর ২৫/২৬টি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য মাত্র দুই হাজার পাঁচশত স্কোয়ার ফিট জায়গা– এটি অত্যন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ব্যাপার । এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির মধ্যে আলোচনা করে জরুরীভিত্তিতে সমবন্টনের পথে যেওয়া উচিৎ ।

১৯৯৪ সাল থেকে ২০০৭ পর্যন্ত প্রতি বছর কলিকাতা পুস্তক মেলার সময় আমাকে সবকিছু মিলিয়ে কলকাতায় এক মাসের মতো অবস্থান করতে হতো । এতে আমি আর্থিকভাবে কতটুকু লাভবান হয়েছি তা আমার বন্ধুরা ভালো জানেন । তবে সবাই সমষ্টিগতভাবে লাভবান হচ্ছে এতেই আমি উচ্ছ্বাসিত, আনন্দিত, গর্বিত । এখন গড়ে প্রতি বছর ২৫/২৬জন প্রকাশক মিলে ১২দিনের মেলায় ষাট থেকে সত্তর লাখ রুপির বই বিক্রয় করে থাকেন । এ ছাড়া সারা বছর তো কলকাতায় বই রপ্তানী হচ্ছে ।

এগুলো কি আমাদের জন্য ইতিবাচক অর্জন নয় !

মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান খোকা
প্রকাশক, বিদ্যাপ্রকাশ-ঢাকা ।

Leave a Reply


*