যেভাবে সেনাপ্রধান হলেন জেনারেল জিয়া

August 16, 2014 8:43 AMViews: 833

সাখাওয়াত লিটন: সময়টা সম্ভবত ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্টের দুপুর বেলা। পরিস্থিতি অনেক নাজুক। লে. কর্নেল এম এ হামিদ ঢাকা সেনানিবাসে জরুরি মিটিং করছিলেন। এসময় হঠাৎ করে টেলিফোন বেঁজে উঠল। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে জেনারেল জিয়া কর্নেল হামিদকে জরুরিভাবে তার দফতরে আসার নির্দেশ দেন। জেনারেল জিয়ার রুমে ঢোকার আগেই তাকে ভালভাবে স্যালুট না করার জন্য কর্নেল হামিদকে মৃদু ভৎসর্না করেন জিয়া। জিয়া বলেন, ‘ভালমত স্যালুট কর। তুমি সেনা প্রধানের অফিসে ঢুকছ’। কর্নেল হামিদ কিছুটা বিস্মিত হলেন। পরিস্থিতি সামলে নিয়ে হাসিমুখে জেনারেল জিয়াকে অভিনন্দন জানালেন। জেনারেল জিয়া হামিদকে একটি চিঠি পড়তে দিলেন। চিঠিতে স্পষ্ট লেখা ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জেনারেল জিয়াকে নতুন সেনা প্রধান হিসেবে নতুন করে নিয়োগ দিয়েছে। নতুন সেনা প্রধান নিয়োগ করার বিষয়ে শফিউল্লাহ কিছুই জানতেন না। তাই কর্নেল হামিদ জিয়াকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘ওনার কাছে একটি কপি পাঠানো দরকার। তিনি হয়ত কয়েক দিন সময় নিয়ে আপনার হাতে সেনা প্রধানের দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন’। এসময় জেনারেল জিয়া বলেন, ‘চুপ কর, আমি আগামী কালই ক্ষমতা বুঝে নেব’। হামিদ জিয়াকে তৎকালীন পরিস্থিতি মাথায় রেখে ক্যু না করে সেনা প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করার বিষয়টি নিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। প্রত্যুত্তরে জেনারেল জিয়া বলেন, ‘হামিদ তুমি বিষয়গুলো বুঝবে না। শফিউল্লাহ খুব চালাক মানুষ। তুমি ঢাকা স্টেশনের সকল অফিসার ও সৈনিকদের একত্রে কর’। হামিদ বুঝতে পারলেন জিয়া এক মুহুর্ত দেরি করতে রাজি নন। হামিদ বুঝিয়ে বললেন যে ঢাকার সব স্টেশন তার অধীনে নয়। তাই প্রতিটি লগ এরিয়া অফিসারদের নির্দেশ দেওয়ার জন্য জেনারেল জিয়াকে অনুরোধ করে অফিস ত্যাগ করেন জেনারেল জিয়ার সাবেক সহপাঠি ও ঢাকা স্টেশন কমান্ডার কর্নেল হামিদ।

16082014_015_GENERAL_ZIA

পরবর্তী দিন সকালে ঢাকা সেনানিবাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। অফিসার ও সৈনিকরা বুঝতে পারছিলেন যে আসলে কি হচ্ছে চারিদিকে। সকাল ৭টা তিরিশ মিনিটে উপ-সেনাপ্রধান জেনারেল উপস্থিত সেনা সদস্যদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। জেনারেল জিয়া বলেন, আজ থেকে আমি সেনাপ্রধান। সকলকেই সেনাবাহিনীর শৃংখলা মেনে চলতে হবে। কেউ বিশৃংখলা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই বলে জেনারেল জিয়া স্থান ত্যাগ করলেন। উপস্থিত সদস্যরা হতবাক ও বিস্মিত হয়ে গেলেন।

এই পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহ অনেকটা অসহায় হয়ে পড়লেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর সেনাবাহিনীর ভেতরে সৃষ্টি হওয়া বিশৃংখলা নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সেনা প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চিঠি তখনও তাকে দেওয়া হয়নি। ঘটনায় হতবাক হয়ে যাওয়া সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ চরম অপমানিত বোধ করলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে মনে দুঃখ নিয়ে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন।

খন্দকার মোস্তাক আহমেদের সরকার সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ পদে এমন সব সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিলেন যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন। শফিউল্লাহকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াকে সেনাপ্রধান বানানোর ঘটনাটি তার স্পষ্ট প্রমাণ। সেনা সদস্যরা বুঝতে পারলেন মূলত মেজর ফারুক ও মেজর রশিদের চাপে সরকার সেনাপ্রধানের পদে পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এই দুই মেজর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। ঘটনার পর এই মেজরকে পদোন্নতি দিয়ে লে. কর্নেল করা হল। তারা নিয়মিত রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়া আসা শুরু করলেন। সেনা সদস্য হয়েও তারা দেশীয় রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে গেলেন। দেশের রাজনীতিতে মাথা ঘামাতে শুরু করলেন এই দুই সেনা সদস্য। বলা যায় খন্দকার মোস্তাককে হাতের পুতুল বানিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন কর্নেল ফরুক ও রশিদ। এই দুজনের এত ক্ষমতা দেখে অনেক উচ্চ পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তারা তাদের সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। এই দুই পথভ্রষ্ট সেনা কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে তৎকালীন সেনা সদর ও ৪৬ পদাতিক বিগ্রেডে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। ফারুক ও রশিদ ৪৬ পদাতিক ডিভিশনের আওতাধীন ছিলেন যার কমান্ডার ছিলেন কর্নেল শাফায়েত জামিল। তারা শাফায়েত জামিলকেও পাত্তা দিতেন না।

ঘটনার পর তৎকালীন চিফ অফ জেনারেল স্টাফ ব্রি. জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল জামিল ফারুক ও রশিদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য জেনারেল জিয়াকে চাপ দিতে থাকেন। সেনাবাহিনীতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য বিদ্রোহী দুই কর্মকর্তাকে বঙ্গভবন থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় জেনারেল জিয়াকে। কিন্তু জেনারেল জিয়া তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন না। বরং জিয়া ফারুক ও রশিদকে সেনাবাহিনীতে আরও শক্তিশালী করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। জেনারেল জিয়া চিফ স্টাফ খালেদ মোশাররফকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করতেন জেনারেল জিয়া। তাই সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন জিয়া। এক পর্যায়ের জিয়া তার শঙ্কা, ভয়ের বিষয়গুলো আরেক জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর কাছে তুলে ধরলেন। জিয়ার ভয়ের বেশ কিছু কারণ ছিল। জেনারেল ওসমানী যিনি মোস্তাক সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন তিনি জিয়াকে ততটা পছন্দ করতেন না। বরং জেনারেল ওসমানী খন্দকার মোশাররফকে সেনাপ্রধান হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফারুক, রশিদ ও অন্যান্য ঘাতকদের চাপে খন্দকার মোস্তাক জেনারেল জিয়াকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগে জেনারেল ওসমানীর কোনো হাত ছিল না।

সেনাপ্রধান হিসেবে পদ গ্রহণ করার পর সেনাবাহিনীতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন জেনারেল জিয়া। একপর্যায়ে এসে সেনাপ্রধান হয়েও মনকে খুশি করতে পারেননি জেনারেল জিয়া। তিনি তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে মনে মনে চিফ মার্শাল ল প্রশাসক হওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে থাকেন। নভেম্বর মাস পার হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সায়েমকে চিফ মার্শাল ল প্রশাসক হিসেবে বহাল রাখাকে বুদ্ধিামানের কাজ মনে করলেন না জেনারেল জিয়া। জিয়া মার্শাল ল প্রশাসক হওয়ার বাসনায় মত্ত হওয়া শুরু করলেন। সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তা বিশেষ করে জেনারেল এরশাদ, জেনারেল মঞ্জুর, জেনারেল মীর শওকত আলী, নৌবাহিনীর প্রধান ও বিমান বাহিনীর প্রধানের সাথে আলোচনা করে এক দিন বিকেলে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সামনে তার প্রস্তাব তুলে ধরেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সায়েম তাকে চিফ মার্শাল ল প্রশাসক হিসেবে মেনে নিতে রাজি হন নি। জিয়া রাষ্ট্রপতিকে ক্রমাগতভাবে চাপ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি বিমান বাহিনীর প্রধান এ জি মাহমুদকে প্রশ্ন করে বলেন, ‘বলুন জেনারেল জিয়ার হাতে চিফ মার্শাল ল প্রশাসকের ক্ষমতা হস্তান্তর করা ঠিক হবে’। বিমান বাহিনী প্রধান বিচারপতির প্রতি চরম শ্রদ্ধাবোধ ছিল। রাষ্ট্রপতির প্রশ্নে বিব্রত হলেন তিনি। কিন্তু জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মত অবস্থা তার ছিল না। তিনি বলেন, স্যার আমি অনেক দুঃখিত, আমি এমন অবস্থানে নেই যেখান থেকে এমন পরিস্থিতিতে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারব। আমি যা করতে পারি তা হল জেনারেল জিয়াকে সমর্থন করা। রাষ্ট্রপতি সায়েমের বিশেষ সহযোগি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার জেনারেল জিয়ার কাছে চিফ মার্শাল ল প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করার জন্য বোঝান। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াকে চিফ মার্শাল ল প্রশাসক হিসেব নিয়োগ দেওয়ার অনুমতি পত্রে সই করেন।
চিফ মার্শাল ল প্রশাসক হয়ে জেনারেল জিয়া সায়েম সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করা শুরু করলেন। একটা সময়ে রাষ্ট্রপতি সায়েমকে কোনঠাসা করে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেন জেনারেল জিয়া।

কিছু কিছু ঘটনায় ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সাথে জেনারেল জিয়ার মেল বন্ধন পাওয়া যায়। ১৫ আগস্ট স্টেনগানের মুখে মেজর ডালিম সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ’র অফিসে ঢুকে তাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে গিয়ে নতুন সরকারের প্রতি তার সমর্থন আদায় করেন। যখন ডালিম অস্ত্রের মুখে শফিউল্লাহকে অফিস থেকে বের করে আনেন সেসময়ে জিয়া সেই অফিসে উপস্থিত ছিলেন। জিয়া ডালিমের পেছনে পেছনে হাঁটছিলেন। যাওয়ার সময় শফিউল্লাহ তার গাড়িতে চড়েন। এসময় ডালিমের দিকে তাকিয়ে জিয়া হেসে বলেন, ডালিম আমার গাড়িতে ওঠো। এসময় ডালিম বলেন, না স্যার আমি কোনো জেনারেলের গাড়িতে চড়তে চাইনা। এই বলে ডালিম তার জিপে উঠে বসলেন। জিয়ার গাড়িটি ডালিমের গাড়ির পেছনে পেছনে আসছিল। একটা সময়ে এসে জিয়ার গাড়ি ভিন্ন রাস্তায় চলে গেল।

জেনারেল জিয়ার সাথে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সখ্যতার বিষয়টি আরও নিশ্চিত হয় যখন মেজর ডালিম, মেজর নূর সেনানিবাসের টেনিস চত্তরে একত্রিত হতেন। এই টেনিস কোর্টে জেনারেল শফিউল্লাহ মাঝে মাঝে আসতেন। একদিন শফিউল্লাহ কর্নেল হামিদকে জিজ্ঞাসা করলেন যে কেন কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা এখানে টেনিস খেলতে আসেন? এসময় হামিদ মেজর নূরকে ডেকে পাঠান এবং কে তাদেরকে এখানে খেলার অনুমতি দিয়েছে সেটি জিজ্ঞাসা করেন। মেজর নূর জানান জেনারেল জিয়া তাদেরকে এখানে টেনিস খেলার অনুমতি দিয়েছেন। হামিদ শফিউল্লাহকে বিষয়টি আগেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু শফিউল্লাহ বিষয়টি মেনে নেননি।

১৯৭৫ সালের এক সন্ধ্যায় জেনারেল মইনুল যখন জেনারেল জিয়ার সাথে বৈঠক করে বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন তখন বাড়ির বাহিরে মেজর ফারুককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। দাঁড়িয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ফারুক জেনারেল জিয়ার সাথে দেখা করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। পরদিন জিয়ার সাথে আলাপকালে মইনুল ফারুকের দেখা করার বিষয়টি জানতে চাইলে জিয়া অকপটে দেখা সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকার করেন। ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি যখন আরও উত্তাল হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে একজন কনিষ্ঠ পদাতিক কর্মকর্তাকে বঙ্গভবনের নিরাপত্তার কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মেজর রশিদ সেই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায় তিনি খালেদ মোশাররফ ও শাফায়েত জামিলের অনুচর। রশিদ জিয়াকে বিষয়টি অবহিত করেন এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। ঘটনার পরে জিয়া মেজর রশিদকে বলেন, রশিদ তুমি চিন্তা কর না। যদি কিছু হয় তবে তা আমার মৃতদেহ পার করেই হবে।

(লেখাটি তৈরি করা হয়েছে মে.জে. (অবঃ) মইনুল হোসেন চৌধুরীর একজন জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য, ব্রি.জে. (অবঃ) সামসুদ্দিন আহমেদের একজন সৈনিকের সাক্ষ্য, লে.কর্নেল (অবঃ) হামিদের তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা ও এ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বাংলাদেশ: রক্তের উত্তরাধিকার বইয়ের সাহায্য নিয়ে।)

Leave a Reply


*