পনেরই আগষ্ট হত্যাকারীদের তাড়িয়েই যাবে

August 13, 2014 9:05 AMViews: 142

সুব্রত বিশ্বাস : ১৫ই আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস। এদিন কুলাঙ্গার গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। যার নেতৃত্বে বাঙালী জাতি স্বাধীনতা ও স্বাধীকারের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। যার আহ্বানে সমগ্র জাতি আত্মত্যাগে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। অকুতোভয় দীপ্ত শপথে উদ্দীপ্ত হয়ে এক সাগর রক্তবন্যার ভেতর দিয়ে ৪৭-এর অভিশপ্ত পাপ মোচন করে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। ১৫ আগষ্টের হত্যাকান্ড সব কিছু ধূলিস্মাৎ হয়ে যায়। শুরু হয় দেশ ও জাতিকে গভীর অন্ধকারে ঠেলে দেয়ার চক্রান্ত। জাতিকে নেতৃত্ব শূণ্য করতে ৩রা নভেম্বর আইনের সকল রীতি নীতি অগ্রাহ্য করে জেলের ভেতর হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে।

11082014_006_BANGABANDHU

তাই ১৫ই আগষ্ট এবং ৩রা নভেম্বরের দু’টি হত্যাকন্ডের পেছনেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত জড়িত। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে হত্যা আর বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে কোন তফাৎ নেই। দুই হত্যাকান্ডেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের হাত রয়েছে। অনেকে এর পেছনে রহস্য খুঁজে বেড়ান। যারা রহস্য খুঁজেন তারা চক্রান্ত ও চক্রান্তকারীদের আড়াল করার উদ্দেশ্যে করে থাকেন। ভারতের মহাত্মা গান্ধী হত্যায় হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদার্য়িক দলগুলোর মিলিত চক্রান্ত ছিল। অপরদিকে ইন্ধিরা গান্ধী হত্যায় বিচ্ছিন্নতাবাদী শিখগোষ্ঠীর উন্মত্ততা স্পষ্ট জেনে এ দু’টি হত্যার পেছনে রহস্য খুঁজতে দেখা যায়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনাকে আড়াল করার জন্য বিভিন্ন রহস্যের প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। বলা হয়েছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে কোন এক আর্মির স্ত্রীর অপমানে বিক্ষোব্ধ আক্রোশেরই ফলশ্রুতি। ব্যক্তিগত আক্রোশে আর্মির একটি গ্রুপ প্রতিশোধ নিতে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। কেবলমাত্র কিছু বিপথগামী ও বহিস্কৃত জুনিয়র আর্মিদের ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা এটি। একই সাথে যোগ করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনিকে। মনি নাকি ক্ষমতা দখলের জন্য এরূপ চক্রন্তে লিপ্ত ছিলেন। এ খবর জেনে আর্মির এই অংশ আগাম এ কাজটি করে ফেলেছে। এভাবেই হত্যাকান্ডকে রহস্যাবৃত করার অপচেষ্টা চলে।

কিন্তু ঘটনা বেশিদিন রহস্যাবৃত রাখা যায়নি। অল্পদিনের মধ্যেই মানুষ বুঝতে পারে এর পেছনে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জড়িত। আমেরিকা, সৌদি আরব, চীন, পাকিন্তান আন্তর্জাতিক এই দেশগুলো যারা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধীতা করেছিল, তারা হত্যাকারীদের শক্তি, সাহস ও ইন্ধন জোগায়। তাদের চক্রান্তের পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করেছে পরাজিত শক্তি ও সেনাবাহিনীর একটি অংশ। ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য আরো পরিস্কার হয়ে ওঠে পরবর্তীতে জেল হত্যা, কর্ণেল তাহেরের ফাঁসী এবং জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বিভিন্ন ক্যু‘র মাধ্যমে মিথ্যা অজুহাতে সামরিক বাহিনীর অসংখ্য জোয়ান ও অফিসারকে হত্যার ভেতর দিয়ে। এভাবেই বাহিরের দেশগুলোর মুখোশ উন্মোচিত হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরই এসব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। তার আগে দেয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রপ্রধানরা শোক বাণী পাঠালেও এরা কেউই পাঠায়নি।

সুতরাং বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পেছনে রহস্য ছিল এটা নিছক মিথ্যাবাদীতা। এটি ছিল একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। যারা এই চক্রান্তের নায়ক ছিল, যারা ভাড়াটিয়া ঘাতকদের দিয়ে এই নির্মম ও নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে, তারা বেশিদিন নিজেদের চেহারা ঢেকে রাখার প্রয়োজন অনুভব করেনি। কারণ, পচাত্তরের হত্যাকান্ডের পর পরই হত্যাকান্ডের দেশীয় অনুচর বা সহযোগিদেরই ক্ষমতায় বসানো হয়। তারা বার বারই ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতায় এসেছে- কখনো সামরিক উর্দি পরে, কখনো গণতন্ত্রের মুখোশ পরে। অন্যদিকে ক্ষমতার আসার পরই তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গবন্ধুর প্রভাব ও নাম নিশানা ধূঁয়ে মুছে ফেলার। প্রচেষ্টা চলে ঘাতকদের মদতদান এবং রাজনীতিতে পূর্ণবাসনে সহায়তা যোগানো। সেই ধারাবাহিকতা আজও বজায় আছে। হত্যাকা-কে গুরুত্বহীন করার জন্য নির্লজ্জভাবে একই দিন খালেদা জিয়ার মিথ্যা জন্মদিন ঘটা করে পালন করা হয়।

তাই ১৫ই আগষ্ট হত্যাকান্ডের বিচার যথাসময়ে হয়নি কিংবা হতে দেওয়া হয়নি। তার কারণ, ঘাতকদের পৃষ্ঠপোষক অথবা সমর্থক সরকার দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থেকেছে। সেকারণে হত্যাকান্ড সম্পর্কে কোনো তদন্ত এবং বিচার অনুষ্ঠিত হতে দেয়নি। এই হত্যাকান্ডের সবচেয়ে বেশী সুবিধাভোগী জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলেই বলতেন আইন তার নিজস্ব পথে চলবে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে শেখ হাসিনা সরকার পচাত্তরের ঘাতকদের বিচারের ব্যবস্থা করে। তবে উচিত ছিল এই বিচারের জন্য একটি বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করা। কিন্তু শেখ হাসিনা কেন তা করেননি জানিনা। বঙ্গবন্ধু তার পিতা বলে অন্যরা দুর্নাম রটাবে হয়তো সেজন্য করতে চাননি। এটাও হয়তো সত্য বিচার বিভাগের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল। অথচ দুঃখের বিষয় ইতিহাসের এই জঘন্যতম হত্যাকান্ডের বিচারে মহামান্য বিচারকরা বিব্রত বোধ করে নতুন কলঙ্ক সৃষ্টি করবেন এটা ভাবতেও অভাক লাগে। পরবর্তীতে ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে একইভাবে ফায়দা লুটার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করছেন, তাঁকে জাতীয় মর্যদার আসনে বসানোর কথা বলছেন অথচ ঘাতকদের বিচারের ব্যাপারে রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের অজুহাত তুলে পাশ কাটিয়ে গেছেন। তারা জাতির পিতার মর্যাদার কথা বলেছেন, অন্যদিকে তাঁর মৃত্যু বার্ষিকী পালনে বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। অতীতেও এভাবে বহু বিধিনিষেধ মৃত বঙ্গবন্ধুর উপর আরোপ করা হয়েছে কিন্তু চাপা দেওয়া যায়নি। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জনগনের অন্তরে গভীরভাবে প্রুথিত সেটাকে উৎপাটন বা ধ্বংস করা বড়ই কঠিন।

Leave a Reply


*