দেশে বিদেশে নতুন প্রজন্ম !!

August 11, 2014 9:21 AMViews: 111

মনজুরুল হাই মুরাদ : বিভিন্ন পরিবেশে থাকার সুযোগ পেলে নানান কিসিমের মানুষের সাথে মেশার কারনে অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক ভারী হয় । একই দেশের মানুষের ভিন্ন ভিন্ন রুপ দেখা যায়।বলা যায় একজন মানুষ তখন অন্য মানুষ চেনার জহুরী হয়ে যায় । ঢাকা শহর থেকে বহু দুরে অজ পাড়া গাঁ, রাজধানী ঢাকা শহর আবার পৃথিবীর রাজধানী বলে খ্যাত আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে দীর্ঘদিন কাটিয়ে এখন আমি মানুষ খুব ভাল চিনতে পারি । যখন যেখানে যেমন মানুষ দেখি আমি ভাল করে তাদের শুধু বাহ্যিক নয় , অন্তর দেখে নেবার চেষ্টা করি । আন্দাজ কখনোই খুব ভুল হয় না আমার ।তাই বলে আমি জ্যোতিষী টাইপ কিছু নই । পোড় খাওয়া মানুষেরা মনে হয় এমনি হয়, কে জানে !

11082014_002_NG_BD

যাই হোক, আজ লিখবো আমাদের সন্তান, নতুন প্রজন্মের মানুষদের কথা। আমার শৈশব , কৈশোর ফ্রেমে বাঁধা কোন ছবি কিংবা সিনেমার আদরের দুলাল টাইপ কিছু ছিল না। ভাল আর মন্দ , আধুনিক আর সেকেলে , ধনী আর গরিব , আসল আর কৃত্তিম, এসবের রকম ফের দেখে আমি অভ্যস্ত । আমার সংসার আর বাবা হবার অভিজ্ঞতা বিদেশেই হয়েছে। পেটের ধান্দায় বাইরে থাকলেও দেশের সাথে আমার যোগাযোগ নিয়মিত । নিয়মিত দেশে যাওয়া ছাড়াও ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন আর দেশের সব ধরনের অগনিত মানুষের যখন তখন বিদেশে বেড়াতে আসার কারণে সব কিছুর সাথে আপডেটেড থাকা খুব সহজ হয়েছে ।

বেড়ে উঠা সন্তান পরিবার , পরিবেশ ,সহপাঠী, শিক্ষালয় এসব থেকেই মুলতঃ পছন্দের বিষয়গুলি বেছে নেয় । পরিবারের প্রভাব সন্তানের উপর সবচেয়ে বেশি । তাই পরিবার তথা পিতা মাতা যেমন করে প্রাথমিক শিক্ষা দেয় শিশুকে ,সন্তান সেটাই অনুসরন করে । সন্তানের একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত এই প্রভাব খুব প্রবল। বলা যায় বারো বছর পর্যন্ত বাবা মা’র প্রভাব আর শিক্ষা সন্তান অবলীলায় গ্রহন করে । এরপর থেকে সন্তানের শারিরীক , মানষিক পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজস্ব মতামত তৈরী হতে থাকে । সেই সময়ে সন্তান পিতা মাতার সকল নিয়ম মানতে না চাইলেও কেউ নিরব থাকে আবার কেউ সরব প্রতিবাদ করে ঝামেলা সৃষ্টি করে ফেলে । জীবনের এই সময়ে একজন কিশোর/কিশোরীর উপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে তার সহপাঠি , ক্ষেত্র বিশেষে একজন শিক্ষক কিংবা খুব পছন্দের কেউ যাকে তারা নিজেদের আদর্শ ভাবতে শুরু করে , তাঁকে অনুসরন করে ।

সন্তানের মানষিক অবস্থা বোঝার জন্য কোন বাবা মা’কে পাশ করা মনোবিজ্ঞানী হতে হয়না। সেই জ্ঞ্যান তাঁরা জন্মগত ভাবেই পেয়ে থাকে । শুধু দেখতে হবে কয়জন বাবা মা সত্যিকার অর্থে সন্তানের বন্ধু হতে পারে , তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা বুঝে ,সুবিধা অনুযায়ী তার সাথে তাল মেলাতে পারে । বাবা মা যখন সন্তানের একান্ত বন্ধু হয় সেই সন্তান বেড়ে উঠে সত্যিকারের আদর্শ মানুষ হিসেবে । যদি বাবা নিজে কিছুটা হলেও আদর্শ মানুষ হয়ে থাকেন তাহলে খুব ভাল হয় ।আজকের বিজ্ঞানের প্রসারের অতি আধুনিক যুগের বাবারা অতি মাত্রায় ব্যস্ত থাকে নিজের কাজ নিয়ে । মায়েরাও খুব পিছিয়ে নাই প্রতিযোগিতায় । মায়েদের কাজ করা মোটেও দোষের কিছু নয় । শুধু দেখতে হবে সেটা কতটা জরুরী ।

শিশু সন্তান কাদা মাটির মত । একটা সময় পর্যন্ত বাবা মা যেমন আকার দিতে চাইবে , সন্তান ঠিক তেমনি হবে । এটা অবধারিত সত্য। রাজপ্রাসাদে হোক আর বস্তিতেই জন্ম নিক – সন্তান সকল শ্রেনীর বাবা মা’র কাছে অমুল্য সম্পদ । শুধু দেখতে হবে সেই অমুল্য সম্পদকে মানুষ কিভাবে দেখা শোনা করে । আদরের মাত্রায় সন্তান যেমন অনেক ভাল , আবেগপ্রবণ , আদর্শ মানুষ হতে পারে , তেমনি আবার হিংসুটে, বখাটে, স্বার্থপরও হতে পারে। বুঝতে হবে সন্তানকে কতটুকু আর কেমন আদর , প্রশ্রয় দিলে সেটা মাত্রা ছাড়াবে না।

প্রবাসে থাকা একজন দম্পতি – তারা কম আর বেশি যতটুকুই শিক্ষিত হোক না কেন, অনেক ভাল কাজ কিংবা নিতান্তই দিন মজুরের কাজ করুক না কেন- সন্তানের প্রতি যত্নশীল হয় । শুধু শিক্ষিত আর বনেদী দম্পতির সন্তান হলেই যে কেউ খুব ভাল মানুষ আর সত্যিকারের শিক্ষিত হয়ে যায় এমন কোন কথা নাই। আবার অল্প শিক্ষিত দম্পতি যারা হয়ত ঠিকমত শুদ্ধ বাংলা কথাই বলতে পারেনা দেখা যায় তাদের সন্তান ফুল স্কলারশীপ নিয়ে এম,আই,টি কিংবা হার্ভার্ডের মত পৃথিবী সেরা কলেজে পড়ছে । বলছিনা , শুধু এসব আইভী লীগ স্কুলে গেলেই শুধু কেউ ভাল ছাত্র আর না গেলেই খারাপ।

দেশে মানুষ নিজের সন্তান নিয়ে অত টেনশন করে না, কারণ নিজের দেশ, নিজের পরিবেশ।বিদেশে থাকা পিতা মাতা মনে করে খুব বেশি খেয়াল না করলে ভীন দেশী পরিবেশে সন্তান বখাটে হয়ে যেতে পারে , আর তেমন কিছু হলে দেশের আত্মীয় স্বজনের কাছে মান থাকবে না।  বিদেশে যেহেতু সব মানুষের ভাই বোন , কাছের আত্মীয় থাকেনা। তাই মানুষ নিজের পেশাগত কাজ আর প্রয়োজনীয় সামাজিকতার বাইরে সন্তানকেই বেশি সময় দেয় । সন্তানের ভাল মন্দ, লেখা পড়ার অগ্রগতি সব কিছুতেই বাবা মার সমান খেয়াল থাকে । সামাজিক সব আচার অনুষ্ঠানে, প্রতিবেশির দাওয়াতে কম বেশি সবাই ছেলে মেয়ে সাথে নিয়ে যায় । এই কারনে বাবা মা’র সাথে ছেলে মেয়েদের এটাচমেন্ট অনেক বেশি । কিন্তু দেশে ছেলে মেয়ে সঙ্গে করে বেড়াতে যাওয়ার রেওয়াজ বলা যায় একেবারেই হারিয়ে গেছে । বাইরের প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের আদব কায়দা , আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ আর সম্পর্ক অনেক আন্তরিক বাবা মায়ের ইচ্ছার কারনে।

বিদেশী স্কুলে পড়ে দেশীয় সংস্কৃতি যেন ভুলে না যায় , ভাষা যেন ভালভাবে পারে , ধর্ম কর্ম যেন ছোটবেলাতেই শিখে নেয় , সেই দিকে এখাণকার বাবা মারা অনেক বেশি সচেতন । এই কারনে দেখা যায় কম বেশি সব পরিবারের ছেলে মেয়েরা দেশের কোন জাতীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে কিছু একটা করছে । কিন্তু খেয়াল করে দেখেছি দেশে অন্তত আমার গন্ডির মানুষগুলির ছেলে মেয়েদের মধ্যে এই সাংস্কৃতিক চর্চা একেবারেই নাই ।

দেশের আজকের শহুরে অবস্থাপন্ন বাবা মা’রা যেন এক ধরনের মোহের ভিতর আছে । সবাই খালি ছুটছে , যেন দৌড় প্রতিযোগিতায় ভাল দৌড়াতে না পারলে পুরো ইভেন্ট থেকেই হারিয়ে যাবে । রাজনৈতিক অস্থিরতা , নিরাপত্তাহীনতা , সামাজিক অবক্ষয় , আর নিয়ম না মেনে চলার অভ্যস্থতায় সকল বিত্তের মানুষ পুরাই অস্থির ,বিরামহীন ,কৃত্তিম মানুষে রুপ নিচ্ছে । শুধু জীবিকার প্রয়োজনে নয় , প্রতিযোগিতায় উপরে থাকার পরিক্ষায় সবাই এতই ব্যস থাকে যে অনেক মানুষই সন্তানের বেড়ে উঠার সময়ে বন্ধু হয়ে সব কিছু শেখানোর কাজ টুকু নিজে পালন করার কথা মনেই রাখে না। বরং সকল আধুনিক সুযোগ সুবিধা, অর্থ, বিদেশ ভ্রমন এসব দিয়ে পুরন করার চেষ্টা করে । কিন্তু এসবে সন্তানের মৌলিক শিক্ষা ব্যাহত হয় । উপরন্ত, সন্তান ক্রমান্বয়ে নিজের বাবা মা, আত্মীয়স্বজন এর কাছ থেকে মানষিক ভাবে অনেক দূরে সরে যায়। নিজের জগত নিয়েই ব্যস্ত থাকে তারা।

প্রবাসের বাবা মা’রা ভিনদেশী সংস্কৃতি যেন ছেলে মেয়েদের উপর কুপ্রভাব বিস্তার না করতে পারে তাই এতই সচেতন থাকে যে দেখা যায় যে তাদের প্রচেষ্টায় বেশির ভাগ ছেলে মেয়ে ধর্মীয় শিক্ষা ছোটবেলাতেই খুব ভাল ভাবে পেয়ে থাকে এবং নিজে থেকেই নিয়মিত চর্চা করে । প্রবাসের প্রজন্মরা তাদের বেড়ে উঠার পথে কোন বাধা বিপত্তি , ঝামেলা , মাথাব্যথা দেখতে পায়না । তাই এরা এতই সহজ সরল আর সৎ হয়ে থাকে যে এদের মনে কোন প্যাচ থাকে না। দেশের মানুষের জন্য ওদের অনেক ভালবাসা জন্ম নেয় । সুযোগ পেলে বাবা মা’র সাথে নিজের মাতৃভুমি দেখতে যেতে চায় । এরা ছল চাতুরী , মিথ্যা বলা কখনো শিখে না, চেষ্টাও করে না। যতটুকু প্রয়োজন ঠিক তাই নিবে , কখনোই কিছু অনিষ্ট করে না । বড় হবার সাথে সাথে এই ছেলে মেয়েদের নিজস্ব স্বকীয়তা তৈরি হতে থাকে। হাইস্কুলে পড়া ছেলে মেয়েরা সামার জব করে বিভিন্ন ধরনের । নিজেদের পকেট মানি যোগাড় করে ।

বিভিন্ন ধরনের ভলান্টারী আর সোসাল ওয়ার্ক করে । এইসব কাজের ভিতর উল্লেখযোগ্য হোলো – ছিন্নমুল মানুষদের জন্য খাবার তৈরিতে সাহায্য করা, বয়স্কদের সাহায্য করা, বিভিন্ন হাস্পাতাল, চার্চে প্রয়োজনীয় সাহায্য করা, লাইব্রেরীতে বই গুছিয়ে রাখা, শিশু কিংবা ভীন দেশী মানুষদের ইংরেজী শেখানোর প্রোগ্রামে অংশগ্রহন করা। মুলতঃ এসব ভলান্টারী কাজের জন্য পাওয়া সার্টিফিকেট কলেজ এডমিশনে কাজ লাগে । প্রবাসের বাঙ্গালী ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকেই একে অপরের সাথে এত আত্মিক ভাবে মেলা মেশা করে যে ওরা সবাই সবাইকে নিজেদের পরিবারের একজন মনে করে । তাই দেখা যায় এদের কারো সাথেই কারো প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর ঘটনা বিরল। কিন্তু কেউ ভীন দেশী কাউকে পছন্দ করে ফেললেও দেখা যায় নিজেদের ধর্মীয় অনুশাসন আর বাবামা’র প্রতি সন্মান দেখিয়ে নিজের ধর্মের কাউকেই নিবে । ফিরিঙ্গিপনার দৃষ্টান্ত যে একেবারে নাই সেটা বলা যাবে না, তবে সেটার সংখ্যা খুব কম ।

অতি আদর আর ধরে রাখার প্রবনতার কারণে অনেক বাবা মা ভাল বংশের পাত্র পাত্রী খুজতে গিয়ে দেশের শরনাপন্ন হয় । এটা অনেক বড় একটা ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে । একই প্রজন্মের মানুষ দুই দেশে বড় হয়ে ভিন্ন মানষিকতার কারনে এদের মধ্যে বিয়ে শাদী হলে সেটা খুব স্বস্তিকর আর দীর্ঘস্থায়ী হয় না সবার ক্ষেত্রে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এরা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি’ অবস্থার ভিতর পড়ে। এজন্যই আমি বলেছি বাবা মা যদি সন্তানের বন্ধু না হতে পারে , সন্তানের মন আর চাহিদা না বুঝে কাজ করে , তাহলে সমস্যা বাড়তে থাকে ।

প্রবাসের প্রজন্ম এতই সহজ সরল আর সোজা লাইনে চলে অভ্যস্থ যে এরা কখনো ভাবে না ওদের বাবা মা’র পেশা নিয়ে , ঘর বাড়ি কিংবা আর্থিক অবস্থা নিয়ে । কখনো তুলনা করে না অন্যদের সাথে । আমাদের দেশের মানুষের অনেক গর্বের বিষয় হোলো বংশ পরিচয় । কথা বললেই দেখা যায় , এমন কেউ নাই যে তার নিকট কিংবা দুরের কেউ জমিদার ছিল না। তাই পাত্র পাত্রী খুজতে গেলেও অন্য পক্ষকেও কোনভাবে জমিদার বংশের কেউ হতে হবে । বাবা মা;র কাছে এটা প্রাধান্য পেলেও প্রবাসের প্রজন্ম এসব বুঝতেই চায়না। ওরা চায় ওদের কাঙ্খিত সময়ে খুজে নিবে জীবন সঙ্গী/ সঙ্গীনী । ওরা কখনোই ভাবে না বাবা মা;র কি সম্পদ আছে দেশে কিংবা বিদেশে ।ওসব নিয়ে ওদের কোন লোভ নাই । দেশের প্রজন্ম এই সম্পদের ব্যাপারটা খুব ভাল বুঝে এবং তার শেয়ার ভালভাবেই আদায় করে । দেশের ছেলে মেয়েদের বিয়ে যেমন বাবা মাই দেয় , তেমনি বিয়ের পর সারাজীবন সন্তান এবং তার স্ত্রী পুত্রদের দায়িত্ব ও বাবা মা’র উপরই বর্তায় ।

সন্তান যেখানেই জন্ম নিক না কেন , বাবা মা তাদের কখনোই ছাড়তে চায়না। কিন্তু বুঝতে হবে সময় হলে সন্তানদের স্বনির্ভর ভাবে চলতে দেয়া উচিত । নইলে ওরা মেরুদন্ড সোজা করে বাঁচতে শিখবে না, দৃষ্টিভঙ্গী বদলাবে না, হৃদয় সংকুচিত হয়েই থাকবে । সমাজ এদের কাছ থেকে কিছুই পাবে না শেখার মত , বরং লুন্ঠিত হবে । সন্তান হবে প্রিয় পাখির মত । খাচায় বন্দী করে রাখলে এই পাখি পাখা মেলে উড়তে শিখে না। উলটা কেউ আদর করতে গেলে তাকে কামড়ে দিতে চায় । কিন্তু খাঁচা খুলে দিলে পাখি হয়ত উড়ে যায় কিন্তু ঘরের পাখি দিনের শেষে ঘরে ফিরবেই । এটাই প্রকৃতির নিয়ম ।

লং আইল্যান্ড , নিউ ইয়র্ক

Leave a Reply


*